সামর্থবান ও সমর্থ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ পালন করা ফরয। আজ থেকে এগার বছর আগে — হিজরি ১৪৩১ ও খ্রিস্টিয় ২০১০ সালে — অনূর্ধ্ব তিরিশ বছর বয়েসী আমার সুযোগ হয়েছিল হজে যাওয়ার। এত অল্প বয়সে ইসলামের পঞ্চম এই স্তম্ভটি পালন করার সুযোগ সবার সামনে আসে না। আল্লাহ সহজ করে দিয়েছিলেন বলেই সুবর্ণ এই সুযোগটি তখনই আমার জীবনে এসেছিল।
হজের সফরের দিনগুলো দেখতে দেখতে পার হয়ে যায়। একের পর এক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও কয়েকদিন পরপর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার ব্যস্ততায় এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যায়। দেশে ফিরে আসার পরই কেবল বোঝা যায় কোথা থেকে কোথায় আবারও চলে আসলাম। সুখস্মৃতিসমূহ বারেবারে ফিরে আসতে থাকতে থাকে। এরই প্রতিক্রিয়ায় জীবন ও জগত সম্পর্কে অমূল্য সব উপলব্ধি অর্জিত হয়।
আজকের দিনে একথা কারও অজানা থাকার কথা নয় যে, হজের এই সফরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে কিছু ব্যবধান ঘটেই থাকে। সারা পৃথিবী থেকে বিশ-তিরিশ লাখ মানুষ একই সময়ে একই স্থানে একই কর্মকান্ড সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হলে এমনটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এই বিষয়ের সঙ্গেই প্রাসঙ্গিক আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটা কথা তাহলে আজ বলেই ফেলি।
হজে যাওয়ার আগে হজ কীভাবে পালন করতে হয় তা নিয়ে আমি বেশ ভালো পড়াশোনা করে গিয়েছিলাম। হজের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা ঠিক সেভাবে সম্পাদন করার প্রস্তুতি নিয়েই আমি রওনা করলাম। হজের সফরে মক্কায় প্রবেশ করার পর প্রথমবার যে উমরা পালন করা হয় সেখানে তাওয়াফের প্রথম কয়েকটি চক্কর হাল্কা দৌড়ে ও শেষ কয়েকটি চক্কর হেঁটে হেঁটে করতে হয় বলে বইতে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু, যেই না জীবনে প্রথমবারের মতো কাবা ঘরকে সামনাসামনি দেখলাম তখন মুহুর্তেই মুখস্থবিদ্যা সব হাওয়া হয়ে গেল। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও অনেক সময় অজানা হয়ে যেতে পারে।
মানুষ ভুলে যেতেই পারে। কিন্তু, তাই বলে একেবারে পরিকল্পিতভাবেই হজের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো অদল-বদল মানুষ কীভাবে আনতে পারে? সেই ঘটনাই এবার ঘটল। হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী যিলহজ মাসের ৮ তারিখ সকালে মক্কার অবস্থানস্থল থেকে হজের ইহরাম বেঁধে নিকটবর্তী মিনা উপত্যকার উদ্দেশ্যে রওনা করার কথা। ৮ তারিখ যোহর থেকে শুরু করে ৯ তারিখের ফজর পর্যন্ত মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায সেখানে আদায় করার পর ৯ তারিখ সকালে মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করতে হয়। কিন্তু, ৭ তারিখ রাতেই বাসে করে আমাদেরকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হলো। বাস্তবতাবোধের কাছে বইয়ের বিদ্যাকে পরাস্ত হতে হলো। মিনায় যাওয়ার পর ৮ তারিখ রাতেই আমাদেরকে আরাফাতে রওনা হওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে বলা হলো। সেই রাতে বাস না আসায় ৯ তারিখ সকালে আমরা আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম।
লাখ লাখ মানুষকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত করতে হলে হাদিসে বর্ণিত প্রতিটি সময়সীমা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা সবার জন্য হয়তো সম্ভবও নয়। হজের ফরয ও ওয়াজিব কাজসমূহের কোনো ক্ষতি না হলে সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত কারণে কখনো কখনো বই ও বাস্তবতা এই উভয়ের মধ্যে বাস্তবতাকেই বেঁছে নেওয়া লাগতে পারে।
আরাফাতের ময়দানে গিয়ে পড়া গেল আরেক বিড়ম্বনায়। বইতে লেখা আছে আরাফাতের দিন আরাফাতের ময়দানে যোহরের ওয়াক্তে যোহর ও আসরের নামায জমা ও কসর করে আদায় করতে হয়। অর্থাৎ, যোহরের ওয়াক্ত হলে খুতবার পর আযান দেওয়া হবে। এরপর যোহরের ইকামত দিয়ে যোহরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করা হবে। এর ঠিক পরপরই যোহরের সেই ওয়াক্তেই আবারও ইকামত দিয়ে আসরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করতে হবে। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কোনো নামায নেই। কিন্তু, আমাদের উপমহাদেশীয় হাজীদের অনেকে আরাফাতের ময়দানেও যোহর ও আসরের নামায এভাবে জমা করার পরিবর্তে তাদের নিজ নিজ ওয়াক্তে আলাদা আলাদাভাবে আদায় করেন। কেউ কসর করেন, কেউ আবার পুরো চার রাকাত আদায় করেন।
মহা মুশকিলে পড়া গেল। ঝামেলা এড়াতে আমি সোজা চলে গেলাম হজের খুতবা দেওয়া হয় যেখানে সেই নামিরা মসজিদে। মসজিদের বাইরে খোলা চত্বরে তীব্র রোদের মধ্যে বসে সৌদি প্রধান মুফতির প্রদান করা হজের খুতবা শুনলাম। এরপর একেবারে বইয়ে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী যোহর ও আসর জামাতের সাথে জমা ও কসর আকারে আদায় করে আবারও নির্ধারিত তাঁবুতে ফিরে এলাম। তখন আমার বয়স কম ছিল। ফলে, কষ্ট হলেও রোদের মধ্যে বেশ অনেকটা পথ যাওয়া-আসা করতে পেরেছিলাম। এখন হলে এই চেষ্টাটুকু হয়তো আমি আর করতাম না। শরীরে কুলাতো না।
সেই সময়ে মতপার্থক্যমূলক এসব বিষয়কে আমি সহজে মেনে নিতে চাইতাম না। আজ হলে হয়তো শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে চুপ থাকতাম। ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান কীভাবে চর্চিত হবে তার খুঁটিনাটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঢের মতপার্থক্য আছে। আরাফাতের দিনে গিয়েও এই মতপার্থক্য থেকে আমাদের রেহাই নেই।
যা-ই হোক, রোদে অনেক কষ্ট করে নামিরা মসজিদ থেকে ফেরত আসার পর ওযু করে নিরিবিলি একটি স্থানে মাত্র বসেছি দুআ করতে। এখন থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল দুআ আর দুআ। কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গ্রুপ লিডার সবাইকে ডেকে ডেকে বাসে উঠিয়ে দিলেন। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। গোটা হজ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টি একান্তে আল্লাহকে ডাকার বদলে অনেক মানুষের সাথে গাদাগাদি করে বাসে বসে কাটিয়ে দিতে হবে?
পরে বুঝেছিলাম আমাদের গ্রুপ লিডার ওই সময়ে আমাদেরকে বাসে উঠিয়ে না দিলে মুযদালিফায় যাওয়ার বাস আমাদের হয়তো আর মিলত না। এসব কথা তো আর বইতে লেখা থাকে না। ফলে, এর জন্য মানসিক কোনো প্রস্তুতিও আমার ছিল না।
সেই বিকাল থেকে বাসে বসে আছি। কিন্তু, বাস খুব একটা এগুচ্ছেই না। না পেরে রাত একটার দিকে আমরা সবাই মাঝপথে বাস থেকে নেমে হাঁটা ধরলাম। অবশেষে রাত আড়াইটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছালাম। প্রায় বারো ঘন্টা পর টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ হলো। মাগরিব ও এশার নামায শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বেজে গেল।
শান্তির সেই ঘুমের বারোটা বাজতে দেড়-দুই ঘণ্টাও লাগল না। একের পর এক হাজীদের দল মিনার দিকে যাচ্ছে আর আমাদের উদ্দেশ্য করে বলছে, “হাজ্জী, গুম। হাজ্জী, গুম।” মানে, হাজী সাহেব ওঠো। উঠে দেখলাম খোলা আকাশের নিচে একটি রাস্তার উপরে চাদর বিছিয়ে আমরা শুয়ে আছি। এই রাতের মুযদালিফাকে দেখলে বোঝা যায় আমি কত ক্ষুদ্র। কত তুচ্ছ। কত নগণ্য। এই একটি রাতে জীবন সম্পর্কে যে উপলব্ধি অর্জিত হয় তা কেবলই বই পড়ে অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।
তত্ত্ব ও বাস্তবতা সবসময় মেলে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি কাজ করা যায় না। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও ভুলে যেতে হয়। সময়ে সময়ে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা লাগে। বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের মতকেও মেনে নিতে হয়। পার্থিব বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়েও এই কথাগুলো প্রযোজ্য। সুস্পষ্ট ফরয লঙ্ঘিত না হলে ও অকাট্য হারামে লিপ্ত হওয়া না লাগলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটিই হয়তো সর্বোত্তম পন্থা। আজ এক দশকেরও পরে এসে হজের সফরে হওয়া এই অভিজ্ঞতাসমূহ থেকে এটিই হলো আমার এখনকার উপলব্ধি।
অনভিজ্ঞ আমার হজ অভিজ্ঞতা: যা ভেবেছিলাম, যা দেখেছি
সামর্থবান ও সমর্থ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ পালন করা ফরয। আজ থেকে এগার বছর আগে — হিজরি ১৪৩১ ও খ্রিস্টিয় ২০১০ সালে — অনূর্ধ্ব তিরিশ বছর বয়েসী আমার সুযোগ হয়েছিল হজে যাওয়ার। এত অল্প বয়সে ইসলামের পঞ্চম এই স্তম্ভটি পালন করার সুযোগ সবার সামনে আসে না। আল্লাহ সহজ করে দিয়েছিলেন বলেই সুবর্ণ এই সুযোগটি তখনই আমার জীবনে এসেছিল।
হজের সফরের দিনগুলো দেখতে দেখতে পার হয়ে যায়। একের পর এক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও কয়েকদিন পরপর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার ব্যস্ততায় এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যায়। দেশে ফিরে আসার পরই কেবল বোঝা যায় কোথা থেকে কোথায় আবারও চলে আসলাম। সুখস্মৃতিসমূহ বারেবারে ফিরে আসতে থাকতে থাকে। এরই প্রতিক্রিয়ায় জীবন ও জগত সম্পর্কে অমূল্য সব উপলব্ধি অর্জিত হয়।
আজকের দিনে একথা কারও অজানা থাকার কথা নয় যে, হজের এই সফরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে কিছু ব্যবধান ঘটেই থাকে। সারা পৃথিবী থেকে বিশ-তিরিশ লাখ মানুষ একই সময়ে একই স্থানে একই কর্মকান্ড সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হলে এমনটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এই বিষয়ের সঙ্গেই প্রাসঙ্গিক আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটা কথা তাহলে আজ বলেই ফেলি।
হজে যাওয়ার আগে হজ কীভাবে পালন করতে হয় তা নিয়ে আমি বেশ ভালো পড়াশোনা করে গিয়েছিলাম। হজের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা ঠিক সেভাবে সম্পাদন করার প্রস্তুতি নিয়েই আমি রওনা করলাম। হজের সফরে মক্কায় প্রবেশ করার পর প্রথমবার যে উমরা পালন করা হয় সেখানে তাওয়াফের প্রথম কয়েকটি চক্কর হাল্কা দৌড়ে ও শেষ কয়েকটি চক্কর হেঁটে হেঁটে করতে হয় বলে বইতে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু, যেই না জীবনে প্রথমবারের মতো কাবা ঘরকে সামনাসামনি দেখলাম তখন মুহুর্তেই মুখস্থবিদ্যা সব হাওয়া হয়ে গেল। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও অনেক সময় অজানা হয়ে যেতে পারে।
মানুষ ভুলে যেতেই পারে। কিন্তু, তাই বলে একেবারে পরিকল্পিতভাবেই হজের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো অদল-বদল মানুষ কীভাবে আনতে পারে? সেই ঘটনাই এবার ঘটল। হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী যিলহজ মাসের ৮ তারিখ সকালে মক্কার অবস্থানস্থল থেকে হজের ইহরাম বেঁধে নিকটবর্তী মিনা উপত্যকার উদ্দেশ্যে রওনা করার কথা। ৮ তারিখ যোহর থেকে শুরু করে ৯ তারিখের ফজর পর্যন্ত মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায সেখানে আদায় করার পর ৯ তারিখ সকালে মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করতে হয়। কিন্তু, ৭ তারিখ রাতেই বাসে করে আমাদেরকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হলো। বাস্তবতাবোধের কাছে বইয়ের বিদ্যাকে পরাস্ত হতে হলো। মিনায় যাওয়ার পর ৮ তারিখ রাতেই আমাদেরকে আরাফাতে রওনা হওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে বলা হলো। সেই রাতে বাস না আসায় ৯ তারিখ সকালে আমরা আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম।
লাখ লাখ মানুষকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত করতে হলে হাদিসে বর্ণিত প্রতিটি সময়সীমা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা সবার জন্য হয়তো সম্ভবও নয়। হজের ফরয ও ওয়াজিব কাজসমূহের কোনো ক্ষতি না হলে সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত কারণে কখনো কখনো বই ও বাস্তবতা এই উভয়ের মধ্যে বাস্তবতাকেই বেঁছে নেওয়া লাগতে পারে।
আরাফাতের ময়দানে গিয়ে পড়া গেল আরেক বিড়ম্বনায়। বইতে লেখা আছে আরাফাতের দিন আরাফাতের ময়দানে যোহরের ওয়াক্তে যোহর ও আসরের নামায জমা ও কসর করে আদায় করতে হয়। অর্থাৎ, যোহরের ওয়াক্ত হলে খুতবার পর আযান দেওয়া হবে। এরপর যোহরের ইকামত দিয়ে যোহরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করা হবে। এর ঠিক পরপরই যোহরের সেই ওয়াক্তেই আবারও ইকামত দিয়ে আসরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করতে হবে। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কোনো নামায নেই। কিন্তু, আমাদের উপমহাদেশীয় হাজীদের অনেকে আরাফাতের ময়দানেও যোহর ও আসরের নামায এভাবে জমা করার পরিবর্তে তাদের নিজ নিজ ওয়াক্তে আলাদা আলাদাভাবে আদায় করেন। কেউ কসর করেন, কেউ আবার পুরো চার রাকাত আদায় করেন।
মহা মুশকিলে পড়া গেল। ঝামেলা এড়াতে আমি সোজা চলে গেলাম হজের খুতবা দেওয়া হয় যেখানে সেই নামিরা মসজিদে। মসজিদের বাইরে খোলা চত্বরে তীব্র রোদের মধ্যে বসে সৌদি প্রধান মুফতির প্রদান করা হজের খুতবা শুনলাম। এরপর একেবারে বইয়ে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী যোহর ও আসর জামাতের সাথে জমা ও কসর আকারে আদায় করে আবারও নির্ধারিত তাঁবুতে ফিরে এলাম। তখন আমার বয়স কম ছিল। ফলে, কষ্ট হলেও রোদের মধ্যে বেশ অনেকটা পথ যাওয়া-আসা করতে পেরেছিলাম। এখন হলে এই চেষ্টাটুকু হয়তো আমি আর করতাম না। শরীরে কুলাতো না।
সেই সময়ে মতপার্থক্যমূলক এসব বিষয়কে আমি সহজে মেনে নিতে চাইতাম না। আজ হলে হয়তো শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে চুপ থাকতাম। ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান কীভাবে চর্চিত হবে তার খুঁটিনাটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঢের মতপার্থক্য আছে। আরাফাতের দিনে গিয়েও এই মতপার্থক্য থেকে আমাদের রেহাই নেই।
যা-ই হোক, রোদে অনেক কষ্ট করে নামিরা মসজিদ থেকে ফেরত আসার পর ওযু করে নিরিবিলি একটি স্থানে মাত্র বসেছি দুআ করতে। এখন থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল দুআ আর দুআ। কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গ্রুপ লিডার সবাইকে ডেকে ডেকে বাসে উঠিয়ে দিলেন। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। গোটা হজ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টি একান্তে আল্লাহকে ডাকার বদলে অনেক মানুষের সাথে গাদাগাদি করে বাসে বসে কাটিয়ে দিতে হবে?
পরে বুঝেছিলাম আমাদের গ্রুপ লিডার ওই সময়ে আমাদেরকে বাসে উঠিয়ে না দিলে মুযদালিফায় যাওয়ার বাস আমাদের হয়তো আর মিলত না। এসব কথা তো আর বইতে লেখা থাকে না। ফলে, এর জন্য মানসিক কোনো প্রস্তুতিও আমার ছিল না।
সেই বিকাল থেকে বাসে বসে আছি। কিন্তু, বাস খুব একটা এগুচ্ছেই না। না পেরে রাত একটার দিকে আমরা সবাই মাঝপথে বাস থেকে নেমে হাঁটা ধরলাম। অবশেষে রাত আড়াইটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছালাম। প্রায় বারো ঘন্টা পর টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ হলো। মাগরিব ও এশার নামায শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বেজে গেল।
শান্তির সেই ঘুমের বারোটা বাজতে দেড়-দুই ঘণ্টাও লাগল না। একের পর এক হাজীদের দল মিনার দিকে যাচ্ছে আর আমাদের উদ্দেশ্য করে বলছে, “হাজ্জী, গুম। হাজ্জী, গুম।” মানে, হাজী সাহেব ওঠো। উঠে দেখলাম খোলা আকাশের নিচে একটি রাস্তার উপরে চাদর বিছিয়ে আমরা শুয়ে আছি। এই রাতের মুযদালিফাকে দেখলে বোঝা যায় আমি কত ক্ষুদ্র। কত তুচ্ছ। কত নগণ্য। এই একটি রাতে জীবন সম্পর্কে যে উপলব্ধি অর্জিত হয় তা কেবলই বই পড়ে অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।
তত্ত্ব ও বাস্তবতা সবসময় মেলে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি কাজ করা যায় না। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও ভুলে যেতে হয়। সময়ে সময়ে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা লাগে। বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের মতকেও মেনে নিতে হয়। পার্থিব বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়েও এই কথাগুলো প্রযোজ্য। সুস্পষ্ট ফরয লঙ্ঘিত না হলে ও অকাট্য হারামে লিপ্ত হওয়া না লাগলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটিই হয়তো সর্বোত্তম পন্থা। আজ এক দশকেরও পরে এসে হজের সফরে হওয়া এই অভিজ্ঞতাসমূহ থেকে এটিই হলো আমার এখনকার উপলব্ধি।
অনভিজ্ঞ আমার হজ অভিজ্ঞতা: যা ভেবেছিলাম, যা দেখেছি
সামর্থবান ও সমর্থ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ পালন করা ফরয। আজ থেকে এগার বছর আগে — হিজরি ১৪৩১ ও খ্রিস্টিয় ২০১০ সালে — অনূর্ধ্ব তিরিশ বছর বয়েসী আমার সুযোগ হয়েছিল হজে যাওয়ার। এত অল্প বয়সে ইসলামের পঞ্চম এই স্তম্ভটি পালন করার সুযোগ সবার সামনে আসে না। আল্লাহ সহজ করে দিয়েছিলেন বলেই সুবর্ণ এই সুযোগটি তখনই আমার জীবনে এসেছিল।
হজের সফরের দিনগুলো দেখতে দেখতে পার হয়ে যায়। একের পর এক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও কয়েকদিন পরপর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার ব্যস্ততায় এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যায়। দেশে ফিরে আসার পরই কেবল বোঝা যায় কোথা থেকে কোথায় আবারও চলে আসলাম। সুখস্মৃতিসমূহ বারেবারে ফিরে আসতে থাকতে থাকে। এরই প্রতিক্রিয়ায় জীবন ও জগত সম্পর্কে অমূল্য সব উপলব্ধি অর্জিত হয়।
আজকের দিনে একথা কারও অজানা থাকার কথা নয় যে, হজের এই সফরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে কিছু ব্যবধান ঘটেই থাকে। সারা পৃথিবী থেকে বিশ-তিরিশ লাখ মানুষ একই সময়ে একই স্থানে একই কর্মকান্ড সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হলে এমনটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এই বিষয়ের সঙ্গেই প্রাসঙ্গিক আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটা কথা তাহলে আজ বলেই ফেলি।
হজে যাওয়ার আগে হজ কীভাবে পালন করতে হয় তা নিয়ে আমি বেশ ভালো পড়াশোনা করে গিয়েছিলাম। হজের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা ঠিক সেভাবে সম্পাদন করার প্রস্তুতি নিয়েই আমি রওনা করলাম। হজের সফরে মক্কায় প্রবেশ করার পর প্রথমবার যে উমরা পালন করা হয় সেখানে তাওয়াফের প্রথম কয়েকটি চক্কর হাল্কা দৌড়ে ও শেষ কয়েকটি চক্কর হেঁটে হেঁটে করতে হয় বলে বইতে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু, যেই না জীবনে প্রথমবারের মতো কাবা ঘরকে সামনাসামনি দেখলাম তখন মুহুর্তেই মুখস্থবিদ্যা সব হাওয়া হয়ে গেল। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও অনেক সময় অজানা হয়ে যেতে পারে।
মানুষ ভুলে যেতেই পারে। কিন্তু, তাই বলে একেবারে পরিকল্পিতভাবেই হজের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো অদল-বদল মানুষ কীভাবে আনতে পারে? সেই ঘটনাই এবার ঘটল। হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী যিলহজ মাসের ৮ তারিখ সকালে মক্কার অবস্থানস্থল থেকে হজের ইহরাম বেঁধে নিকটবর্তী মিনা উপত্যকার উদ্দেশ্যে রওনা করার কথা। ৮ তারিখ যোহর থেকে শুরু করে ৯ তারিখের ফজর পর্যন্ত মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায সেখানে আদায় করার পর ৯ তারিখ সকালে মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করতে হয়। কিন্তু, ৭ তারিখ রাতেই বাসে করে আমাদেরকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হলো। বাস্তবতাবোধের কাছে বইয়ের বিদ্যাকে পরাস্ত হতে হলো। মিনায় যাওয়ার পর ৮ তারিখ রাতেই আমাদেরকে আরাফাতে রওনা হওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে বলা হলো। সেই রাতে বাস না আসায় ৯ তারিখ সকালে আমরা আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম।
লাখ লাখ মানুষকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত করতে হলে হাদিসে বর্ণিত প্রতিটি সময়সীমা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা সবার জন্য হয়তো সম্ভবও নয়। হজের ফরয ও ওয়াজিব কাজসমূহের কোনো ক্ষতি না হলে সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত কারণে কখনো কখনো বই ও বাস্তবতা এই উভয়ের মধ্যে বাস্তবতাকেই বেঁছে নেওয়া লাগতে পারে।
আরাফাতের ময়দানে গিয়ে পড়া গেল আরেক বিড়ম্বনায়। বইতে লেখা আছে আরাফাতের দিন আরাফাতের ময়দানে যোহরের ওয়াক্তে যোহর ও আসরের নামায জমা ও কসর করে আদায় করতে হয়। অর্থাৎ, যোহরের ওয়াক্ত হলে খুতবার পর আযান দেওয়া হবে। এরপর যোহরের ইকামত দিয়ে যোহরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করা হবে। এর ঠিক পরপরই যোহরের সেই ওয়াক্তেই আবারও ইকামত দিয়ে আসরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করতে হবে। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কোনো নামায নেই। কিন্তু, আমাদের উপমহাদেশীয় হাজীদের অনেকে আরাফাতের ময়দানেও যোহর ও আসরের নামায এভাবে জমা করার পরিবর্তে তাদের নিজ নিজ ওয়াক্তে আলাদা আলাদাভাবে আদায় করেন। কেউ কসর করেন, কেউ আবার পুরো চার রাকাত আদায় করেন।
মহা মুশকিলে পড়া গেল। ঝামেলা এড়াতে আমি সোজা চলে গেলাম হজের খুতবা দেওয়া হয় যেখানে সেই নামিরা মসজিদে। মসজিদের বাইরে খোলা চত্বরে তীব্র রোদের মধ্যে বসে সৌদি প্রধান মুফতির প্রদান করা হজের খুতবা শুনলাম। এরপর একেবারে বইয়ে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী যোহর ও আসর জামাতের সাথে জমা ও কসর আকারে আদায় করে আবারও নির্ধারিত তাঁবুতে ফিরে এলাম। তখন আমার বয়স কম ছিল। ফলে, কষ্ট হলেও রোদের মধ্যে বেশ অনেকটা পথ যাওয়া-আসা করতে পেরেছিলাম। এখন হলে এই চেষ্টাটুকু হয়তো আমি আর করতাম না। শরীরে কুলাতো না।
সেই সময়ে মতপার্থক্যমূলক এসব বিষয়কে আমি সহজে মেনে নিতে চাইতাম না। আজ হলে হয়তো শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে চুপ থাকতাম। ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান কীভাবে চর্চিত হবে তার খুঁটিনাটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঢের মতপার্থক্য আছে। আরাফাতের দিনে গিয়েও এই মতপার্থক্য থেকে আমাদের রেহাই নেই।
যা-ই হোক, রোদে অনেক কষ্ট করে নামিরা মসজিদ থেকে ফেরত আসার পর ওযু করে নিরিবিলি একটি স্থানে মাত্র বসেছি দুআ করতে। এখন থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল দুআ আর দুআ। কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গ্রুপ লিডার সবাইকে ডেকে ডেকে বাসে উঠিয়ে দিলেন। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। গোটা হজ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টি একান্তে আল্লাহকে ডাকার বদলে অনেক মানুষের সাথে গাদাগাদি করে বাসে বসে কাটিয়ে দিতে হবে?
পরে বুঝেছিলাম আমাদের গ্রুপ লিডার ওই সময়ে আমাদেরকে বাসে উঠিয়ে না দিলে মুযদালিফায় যাওয়ার বাস আমাদের হয়তো আর মিলত না। এসব কথা তো আর বইতে লেখা থাকে না। ফলে, এর জন্য মানসিক কোনো প্রস্তুতিও আমার ছিল না।
সেই বিকাল থেকে বাসে বসে আছি। কিন্তু, বাস খুব একটা এগুচ্ছেই না। না পেরে রাত একটার দিকে আমরা সবাই মাঝপথে বাস থেকে নেমে হাঁটা ধরলাম। অবশেষে রাত আড়াইটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছালাম। প্রায় বারো ঘন্টা পর টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ হলো। মাগরিব ও এশার নামায শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বেজে গেল।
শান্তির সেই ঘুমের বারোটা বাজতে দেড়-দুই ঘণ্টাও লাগল না। একের পর এক হাজীদের দল মিনার দিকে যাচ্ছে আর আমাদের উদ্দেশ্য করে বলছে, “হাজ্জী, গুম। হাজ্জী, গুম।” মানে, হাজী সাহেব ওঠো। উঠে দেখলাম খোলা আকাশের নিচে একটি রাস্তার উপরে চাদর বিছিয়ে আমরা শুয়ে আছি। এই রাতের মুযদালিফাকে দেখলে বোঝা যায় আমি কত ক্ষুদ্র। কত তুচ্ছ। কত নগণ্য। এই একটি রাতে জীবন সম্পর্কে যে উপলব্ধি অর্জিত হয় তা কেবলই বই পড়ে অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।
তত্ত্ব ও বাস্তবতা সবসময় মেলে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি কাজ করা যায় না। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও ভুলে যেতে হয়। সময়ে সময়ে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা লাগে। বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের মতকেও মেনে নিতে হয়। পার্থিব বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়েও এই কথাগুলো প্রযোজ্য। সুস্পষ্ট ফরয লঙ্ঘিত না হলে ও অকাট্য হারামে লিপ্ত হওয়া না লাগলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটিই হয়তো সর্বোত্তম পন্থা। আজ এক দশকেরও পরে এসে হজের সফরে হওয়া এই অভিজ্ঞতাসমূহ থেকে এটিই হলো আমার এখনকার উপলব্ধি।
অনভিজ্ঞ আমার হজ অভিজ্ঞতা: যা ভেবেছিলাম, যা দেখেছি
সামর্থবান ও সমর্থ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার হলেও হজ পালন করা ফরয। আজ থেকে এগার বছর আগে — হিজরি ১৪৩১ ও খ্রিস্টিয় ২০১০ সালে — অনূর্ধ্ব তিরিশ বছর বয়েসী আমার সুযোগ হয়েছিল হজে যাওয়ার। এত অল্প বয়সে ইসলামের পঞ্চম এই স্তম্ভটি পালন করার সুযোগ সবার সামনে আসে না। আল্লাহ সহজ করে দিয়েছিলেন বলেই সুবর্ণ এই সুযোগটি তখনই আমার জীবনে এসেছিল।
হজের সফরের দিনগুলো দেখতে দেখতে পার হয়ে যায়। একের পর এক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও কয়েকদিন পরপর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার ব্যস্ততায় এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যায়। দেশে ফিরে আসার পরই কেবল বোঝা যায় কোথা থেকে কোথায় আবারও চলে আসলাম। সুখস্মৃতিসমূহ বারেবারে ফিরে আসতে থাকতে থাকে। এরই প্রতিক্রিয়ায় জীবন ও জগত সম্পর্কে অমূল্য সব উপলব্ধি অর্জিত হয়।
আজকের দিনে একথা কারও অজানা থাকার কথা নয় যে, হজের এই সফরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে কিছু ব্যবধান ঘটেই থাকে। সারা পৃথিবী থেকে বিশ-তিরিশ লাখ মানুষ একই সময়ে একই স্থানে একই কর্মকান্ড সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হলে এমনটা হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এই বিষয়ের সঙ্গেই প্রাসঙ্গিক আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটা কথা তাহলে আজ বলেই ফেলি।
হজে যাওয়ার আগে হজ কীভাবে পালন করতে হয় তা নিয়ে আমি বেশ ভালো পড়াশোনা করে গিয়েছিলাম। হজের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা ঠিক সেভাবে সম্পাদন করার প্রস্তুতি নিয়েই আমি রওনা করলাম। হজের সফরে মক্কায় প্রবেশ করার পর প্রথমবার যে উমরা পালন করা হয় সেখানে তাওয়াফের প্রথম কয়েকটি চক্কর হাল্কা দৌড়ে ও শেষ কয়েকটি চক্কর হেঁটে হেঁটে করতে হয় বলে বইতে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু, যেই না জীবনে প্রথমবারের মতো কাবা ঘরকে সামনাসামনি দেখলাম তখন মুহুর্তেই মুখস্থবিদ্যা সব হাওয়া হয়ে গেল। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও অনেক সময় অজানা হয়ে যেতে পারে।
মানুষ ভুলে যেতেই পারে। কিন্তু, তাই বলে একেবারে পরিকল্পিতভাবেই হজের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো অদল-বদল মানুষ কীভাবে আনতে পারে? সেই ঘটনাই এবার ঘটল। হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী যিলহজ মাসের ৮ তারিখ সকালে মক্কার অবস্থানস্থল থেকে হজের ইহরাম বেঁধে নিকটবর্তী মিনা উপত্যকার উদ্দেশ্যে রওনা করার কথা। ৮ তারিখ যোহর থেকে শুরু করে ৯ তারিখের ফজর পর্যন্ত মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায সেখানে আদায় করার পর ৯ তারিখ সকালে মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করতে হয়। কিন্তু, ৭ তারিখ রাতেই বাসে করে আমাদেরকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হলো। বাস্তবতাবোধের কাছে বইয়ের বিদ্যাকে পরাস্ত হতে হলো। মিনায় যাওয়ার পর ৮ তারিখ রাতেই আমাদেরকে আরাফাতে রওনা হওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে বলা হলো। সেই রাতে বাস না আসায় ৯ তারিখ সকালে আমরা আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম।
লাখ লাখ মানুষকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত করতে হলে হাদিসে বর্ণিত প্রতিটি সময়সীমা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা সবার জন্য হয়তো সম্ভবও নয়। হজের ফরয ও ওয়াজিব কাজসমূহের কোনো ক্ষতি না হলে সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত কারণে কখনো কখনো বই ও বাস্তবতা এই উভয়ের মধ্যে বাস্তবতাকেই বেঁছে নেওয়া লাগতে পারে।
আরাফাতের ময়দানে গিয়ে পড়া গেল আরেক বিড়ম্বনায়। বইতে লেখা আছে আরাফাতের দিন আরাফাতের ময়দানে যোহরের ওয়াক্তে যোহর ও আসরের নামায জমা ও কসর করে আদায় করতে হয়। অর্থাৎ, যোহরের ওয়াক্ত হলে খুতবার পর আযান দেওয়া হবে। এরপর যোহরের ইকামত দিয়ে যোহরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করা হবে। এর ঠিক পরপরই যোহরের সেই ওয়াক্তেই আবারও ইকামত দিয়ে আসরের নামায দুই রাকাত কসর আকারে আদায় করতে হবে। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কোনো নামায নেই। কিন্তু, আমাদের উপমহাদেশীয় হাজীদের অনেকে আরাফাতের ময়দানেও যোহর ও আসরের নামায এভাবে জমা করার পরিবর্তে তাদের নিজ নিজ ওয়াক্তে আলাদা আলাদাভাবে আদায় করেন। কেউ কসর করেন, কেউ আবার পুরো চার রাকাত আদায় করেন।
মহা মুশকিলে পড়া গেল। ঝামেলা এড়াতে আমি সোজা চলে গেলাম হজের খুতবা দেওয়া হয় যেখানে সেই নামিরা মসজিদে। মসজিদের বাইরে খোলা চত্বরে তীব্র রোদের মধ্যে বসে সৌদি প্রধান মুফতির প্রদান করা হজের খুতবা শুনলাম। এরপর একেবারে বইয়ে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী যোহর ও আসর জামাতের সাথে জমা ও কসর আকারে আদায় করে আবারও নির্ধারিত তাঁবুতে ফিরে এলাম। তখন আমার বয়স কম ছিল। ফলে, কষ্ট হলেও রোদের মধ্যে বেশ অনেকটা পথ যাওয়া-আসা করতে পেরেছিলাম। এখন হলে এই চেষ্টাটুকু হয়তো আমি আর করতাম না। শরীরে কুলাতো না।
সেই সময়ে মতপার্থক্যমূলক এসব বিষয়কে আমি সহজে মেনে নিতে চাইতাম না। আজ হলে হয়তো শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে চুপ থাকতাম। ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান কীভাবে চর্চিত হবে তার খুঁটিনাটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঢের মতপার্থক্য আছে। আরাফাতের দিনে গিয়েও এই মতপার্থক্য থেকে আমাদের রেহাই নেই।
যা-ই হোক, রোদে অনেক কষ্ট করে নামিরা মসজিদ থেকে ফেরত আসার পর ওযু করে নিরিবিলি একটি স্থানে মাত্র বসেছি দুআ করতে। এখন থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল দুআ আর দুআ। কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গ্রুপ লিডার সবাইকে ডেকে ডেকে বাসে উঠিয়ে দিলেন। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। গোটা হজ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টি একান্তে আল্লাহকে ডাকার বদলে অনেক মানুষের সাথে গাদাগাদি করে বাসে বসে কাটিয়ে দিতে হবে?
পরে বুঝেছিলাম আমাদের গ্রুপ লিডার ওই সময়ে আমাদেরকে বাসে উঠিয়ে না দিলে মুযদালিফায় যাওয়ার বাস আমাদের হয়তো আর মিলত না। এসব কথা তো আর বইতে লেখা থাকে না। ফলে, এর জন্য মানসিক কোনো প্রস্তুতিও আমার ছিল না।
সেই বিকাল থেকে বাসে বসে আছি। কিন্তু, বাস খুব একটা এগুচ্ছেই না। না পেরে রাত একটার দিকে আমরা সবাই মাঝপথে বাস থেকে নেমে হাঁটা ধরলাম। অবশেষে রাত আড়াইটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছালাম। প্রায় বারো ঘন্টা পর টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ হলো। মাগরিব ও এশার নামায শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বেজে গেল।
শান্তির সেই ঘুমের বারোটা বাজতে দেড়-দুই ঘণ্টাও লাগল না। একের পর এক হাজীদের দল মিনার দিকে যাচ্ছে আর আমাদের উদ্দেশ্য করে বলছে, “হাজ্জী, গুম। হাজ্জী, গুম।” মানে, হাজী সাহেব ওঠো। উঠে দেখলাম খোলা আকাশের নিচে একটি রাস্তার উপরে চাদর বিছিয়ে আমরা শুয়ে আছি। এই রাতের মুযদালিফাকে দেখলে বোঝা যায় আমি কত ক্ষুদ্র। কত তুচ্ছ। কত নগণ্য। এই একটি রাতে জীবন সম্পর্কে যে উপলব্ধি অর্জিত হয় তা কেবলই বই পড়ে অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।
তত্ত্ব ও বাস্তবতা সবসময় মেলে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি কাজ করা যায় না। পরিস্থিতির উত্তেজনায় জানা জিনিসও ভুলে যেতে হয়। সময়ে সময়ে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা লাগে। বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের মতকেও মেনে নিতে হয়। পার্থিব বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়েও এই কথাগুলো প্রযোজ্য। সুস্পষ্ট ফরয লঙ্ঘিত না হলে ও অকাট্য হারামে লিপ্ত হওয়া না লাগলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটিই হয়তো সর্বোত্তম পন্থা। আজ এক দশকেরও পরে এসে হজের সফরে হওয়া এই অভিজ্ঞতাসমূহ থেকে এটিই হলো আমার এখনকার উপলব্ধি।